পাগলিনী: আব্দুল কুদ্দুস পবণ

পাগলিনী গল্পটি লিখেছেন লেখক,কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুস পবণ।কোন ব্যাক্তির সাথে কাকতালীয় ভাবে মিলে গেলে আমরা দায়ী থাকিব না। কেননা এটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

কে সে? কোথা হইতে আগমন তাহার? কোন্ প্রান্তের পাষাণপৃষ্ঠ ভেদ করিয়া এই জনপদে সে উপস্থিত হইল—এ রহস্যে সমগ্র বাজারবাসী নিঃসন্দেহে বিস্ময়াকুল। কোনো ব্যক্তি তাহার নাম জানে না, বংশপরিচয় জানে না, এমনকি তাহার ভাষা ও গতি-বিধির মধ্যে লেশমাত্র আত্মপ্রকাশও পরিলক্ষিত হয় না।
তবে একটিই দৃশ্য প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করিত মানুষ—দীর্ঘ, এলোমেলো কেশে আচ্ছন্ন এক নারী,যাহার বয়স আনুমানিক ষোড়শ অথবা ততোধিক। তাহার মুখাবয়বে এক রহস্যময় সৌন্দর্যের ছায়া, বুদ্ধিমত্তার চিহ্ন, আবার তাহার দৃষ্টিতে এমন এক অন্তর্লীন উদাসীনতা, যেন ইহলোকে সে উপস্থিত থাকিলেও চেতনায় অবস্থান করে অন্য কোনো অস্তিত্বলোকে।
বাজারের পাশঘেঁষা দীঘির পাড়ে সে একটি নির্জনতম স্থান বেছে লইয়া বসবাস আরম্ভ করে। দিনে কোনো দোকানদার যদি কিছু দান করিত, তাহা গ্রহণ করিত নিঃশব্দে; না করিলে উপবাসে দিন কাটাইত, তথাপি কাহারও নিকট কাকুতি-মিনতি করিত না।
সে কাহারও নিকট দয়া প্রার্থনা করিত না, কাহারো ক্ষতি সাধন করিত না, এমনকি অনার্য পাগলদিগের ন্যায় অশ্রাব্য বাক্যও উচ্চারণ করিত না। তাহার নীরবতা ছিলো একপ্রকার দার্শনিক নিরাসক্তি।
রাত্রি হইলে সে আশ্রয় গ্রহণ করিত দীঘির পার্শ্বস্থিত কবরস্থানসংলগ্ন পারে,যেখানে নিশীথে জোনাকিরাও জ্বলিতে ভীত হয়।
এইরূপে কেটেছিল কিছু মাস।
অতঃপর লোকেরা লক্ষ করিল—তাহার উদর দিনদিন বৃহৎ হইতেছে।
প্রথমে বিস্ময়ের সঞ্চার হইল, পরে কুটুক্তির বিস্তার ঘটিল।
বাজারপাড়া ও আশপাশের লোকের মুখে মুখে উচ্চারিত হইতে লাগিল কঠোর বাক্যাবলী—
“কলঙ্কিনী!”
“অসভ্য, চরিত্রহীনা।”
“আমাদের এলাকার বদনাম করিতে আসিয়াছে।”
কিন্তু কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন জন বলিল—
“পাগলির সঙ্গে যে এমন পাশবিক আচরণ করিয়াছে, সে তো মনুষ্যরূপী শয়তান। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌র গজব তাহার উপর পড়িবে।”
এইভাবেই কিছুদিন অতিবাহিত হইবার পর, এক বর্ষাসিক্ত মৌসুমে পাগলী সন্তান প্রসব করিল—একটি কন্যা সন্তান।
দীঘির কাদায়, রক্তে, জলে, নিঃসীম স্তব্ধতায় সে শিশুটিকে কোলে লইয়া স্থিরদৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকিল—না কোনো আহাজারি, না কোনো আনন্দ, কেবল এক অচিন্ত্য বিষণ্নতার অভিব্যক্তি।
বাজারবাসীগণ তাহার নিকট উপস্থিত হইল।
কেহ পুরাতন কাপড় আনিল, কেহ প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করিল, কেহ বা কেবল নিরবদৃষ্টিতে তাহার শূন্য মুখাবয়ব নিরীক্ষণ করিল।
তবু সবার মনে উদ্বেগ—
“পাগলী তো চেতনা-বিবর্জিত, বাচ্চাটিকে কোনো অমঙ্গল না করে বসে?”
তখনই একজন সুশিক্ষিত, মার্জিত যুবক সম্মুখে আসিয়া কহিল—
“আমার একমাত্র বোন বহুদিন ধরিয়া নিঃসন্তান। ইহা যদি তাহার কোলে দিয়া দেই, তাহা হইলে শিশুটি মানবিক পরিচর্যায় মানুষ হইবে এবং আমার বোনের হৃদয়ে আলো ফিরিয়া আসিবে।”
সম্মিলিত জনমতের সহিত তাহার প্রস্তাব গৃহীত হইল।
অতঃপর পাগলীর সম্মুখে দশ হাজার টাকা উপস্থিত করিয়া, শিশুটিকে তাহার কোল হইতে সরাইয়া লইয়া যাওয়া হইল।
পাগলী চাহিয়া রহিল—নিঃশব্দ, নির্বাক।
কোনো আহ্বান, কোনো অনুরোধ, কোনো কান্না—কিছুই প্রকাশ করিল না।
পরবর্তী দিন দেখা গেল, পাগলী দিয়াশলাইয়ের আগুনে এক এক করিয়া টাকা পুড়াইয়া ফেলিতেছে।
কোনো ব্যাখ্যা নাই, কোনো যুক্তি নাই—তবে হয়তো তাহার মধ্যে একরাশ অভিমান ও এক গভীর ক্ষোভ লুকাইয়া ছিল, যাহা দগ্ধ করিয়া দিয়াছে কাগজে আঁকা সংখ্যাগুলিকে।
বাকি অর্থের কী হইল, কেহ জানিল না।
কেহ বলিল, সে নিজেই ফেলে দিয়াছে; কেহ বলিল, কিছু দুষ্টু বালকদল লইয়া গিয়াছে।
কিন্তু তাহার চেয়েও অধিক আশ্চর্য যাহা, তাহা হইল এই—এরপর কেহ আর কখনো পাগলীকে দেখিল না।

না বাজারে, না দীঘির পার্শ্বে, না কবরস্থানের ধারে।
সেই শূন্য জায়গা, যেখানে সে একদিন নিঃসঙ্গতা লইয়া বসিয়া থাকিত, আজ কেবল বাতাস বহিয়া যায়,দিঘীর ঢেউ আজও থামিয়া নাই,ঢেউয়ের পরে ঢেউ ভাঙ্গে, আর কখনো কখনো যেন দীঘির জলে একফোঁটা জল টুপ্ করিয়া পড়ে—যেন কোনো সর্বহারা নির্দোষ অসহায় নারীর অশ্রুবিন্দু!

উপসংহারঃ
পাগলী কে ছিল,কোথায় হইতে আসিল,একটি গল্পকাহিনীর জন্ম দিয়া নিজের কলিজার এক ক্ষুদ্র খণ্ড রাখিয়া আবার কোথায় চলিয়া গেল,বাঁচিয়া আছে নাকি ত‍্যাগ করিয়াছে নিঠুর পৃথিবী,কাহার কন্যা, কাহার প্রেমিকা,কাহার শত্রু—তাহা ইতিহাস জানে না।জানিবার আবশ্যক মনে করেনা।দিবস রজনী বহিয়া যায়।দূরে,কোনো অজ্ঞাত গাঁয়ে,মানুষের মত মানুষ হইবার অভিপ্রায়ে জননীর চেহারাসদৃশ একটি পুষ্পবালিকা মেঠোপথ মাড়িয়া নিকেতনে যায়।সেও জানেনা যাহার চামড়া ফাটিয়া সে দুনিয়াতে আসিয়াছে,গর্ভধারিণী কোথায়!
(দ্রষ্টব‍্যঃ এই গল্পের কাহিনী বা বিন্দু অংশবিশেষ কোনো মানুষের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে একটুও সাদৃশ্য থাকলে আমি নিরুপায়।গল্পের প্রচ্ছদছবি কাহিনীর সামঞ্জস্যে নির্মিত,বাস্তবতার সঙ্গে মিলহীন)।
Abdul Quddush Paban

৩ জুলাই।
বৃহস্পতিবার।

কুমিল্লা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top