সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট-বায়েজিদ লিংক রোড়ে পাহাড় ধসে সড়কে প্রতিবন্ধকতা IMG_20210607_183419 Full view

সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট-বায়েজিদ লিংক রোড়ে পাহাড় ধসে সড়কে প্রতিবন্ধকতা

বার্তাঃচট্রগ্রাম সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট -বায়েজিদ লিংক রোড নির্মাণ করে সরকার চট্টগ্রাম শহরকে যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে । প্রায় এক বছরের অধিক সময় আগে সড়কটি চালু হয়েছে। কিন্তু সড়কটির দুই পাশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকা ১৬টি পাহাড়কে ঝুঁকিমুক্ত করতে সিদ্ধান্ত হয়নি এই দীর্ঘ সময়ে। এরমধ্যে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ধস শুরু হয়েছে পাহাড়গুলোতে। রোববারের টানা বৃষ্টির পর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরামর্শে সড়কটি দুইদিকেই যান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সোমবার সকাল থেকেই সড়কটি বন্ধ করে দেয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছেন সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস।

জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট টোল রোডের মুখ থেকে বায়েজিদ বোস্তামি পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সিডিএ। প্রকল্পের আওতায় একটি রেলওয়ে ওভারব্রিজসহ ছয়টি ব্রিজ এবং কয়েকটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের ৬ কি.মি. রাস্তা নির্মাণে কাটা হয় ১৬টি পাহাড়। একেবারে নতুন রাস্তাটি নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আড়াই লাখ ঘনফুট পাহাড় কাটার অনুমোদন নেয়া হলেও সিডিএ ১০ লাখ ৩০ হাজার ঘনফুট পাহাড় কাটে। এনিয়ে সিডিএকে নোটিশ করে গত বছরের ২৯ জানুয়ারি শুনানিতে তলব করে পরিবেশ অধিদপ্তর। শুনানিতে অনুমোদনের চেয়ে বেশি পাহাড় কেটে জীববৈচিত্র ধ্বংস, পাহাড়ের উপরিভাগের মাটি এবং ভূমির বাইন্ডিং ক্যাপাসিটি নষ্টসহ পরিবেশ-প্রতিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। শুনানি শেষে সিডিএকে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৩ টাকা জরিমানা করেন অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) রুবিনা ফেরদৌসী। এরপর ৬ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নকশা না মেনে পাহাড় কাটার অভিযোগ তুলেন সিডিএ’র বিরুদ্ধে। তবে জরিমানার বিষয়টি নিয়ে বন পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে আপিল করে সিডিএ। বিষয়টি এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরবর্তীতে ঝুঁকিপূর্ণ খাড়া পাহাড়গুলো নতুন করে কাটার জন্য গত বছরের ২৩ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তরে নতুন করে আবেদন করে সিডিএ। করোনাকালে লকডাউনের কারণে গত বছরের ৩১ মে চিঠিটি পরিবেশ অধিদপ্তরের হস্তগত হয়। ওই আবেদনে ৩ লাখ ৩২ হাজার ঘনমিটার পাহাড় কাটার অনুমতি চায় সিডিএ। প্রকল্পে আগে কাটা ১৬টি পাহাড় ২২.৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে কাটার জন্য সিডিএ প্রস্তাবনা দিলেও না করে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। পরে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অনুমোদন চাওয়া হলেও ২২.৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে পাহাড় কাটার অনুমতি মেলেনি। এরপর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো কাটা ও সংরক্ষণ কিভাবে করা হবে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতসহ প্রতিবেদন চায় পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপর সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে প্রকল্পটির পরিচালক ও চুয়েটের দুই শিক্ষকের সমন্বয়ে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এরপর কমিটির সদস্য বুয়েটের দুই শিক্ষক ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ নিয়ে গত কয়েকমাস সময় অতিবাহিত হলেও করোনা প্রাদুর্ভাবসহ নানা জটিলতায় প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেনি বিশেষজ্ঞ কমিটি।

এদিকে সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে চিঠি চালাচালির মধ্যে নতুন করে বর্ষা মৌসুম শুরু হয়। চলতি মৌসুমে গতকাল রোববার প্রথমবারের মতো ভারী বর্ষণ শুরু হয়। ভারী বর্ষণে ভিজে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে নতুন করে ধস শুরু হয়।

সরেজমিন রোববার দুপুরে দেখা গেছে, ফৌজদারহাটগামী সড়কের মধ্যপথে বাম পাশের কিছু অংশে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। সিডিএ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সন্নিকটের ঝুঁকিপূর্ণ দুটি পাহাড় ধসের আশংকায় প্রায় দুই মাস আগে থেকে ওই অংশটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ওই বন্ধ অংশে রোববার দুপুরে দেখা যায়, একটি পাহাড়ের উপর থেকে কিছু অংশ ধসে রাস্তায় পড়েছে। একইসাথে রাস্তার ধারে কাটা ১৬ পাহাড়ের বেশ কয়েকটি বৃষ্টির পানিতে ভিজে অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

সূত্র জানায়, রোববার ভারী বৃষ্টিতে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এরমধ্যে পাহাড়গুলো থেকে অবৈধ স্থাপনা ও বসতি থেকে লোকজনকে সরানোর কাজ শুরু করে জেলা প্রশাসন। বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডের আশপাশের পাহাড়গুলোতেও ধস শুরু হয়। এরপর দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোডটিতে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়ার জন্য রোববার সকাল ১০টার দিকে সিডিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। তারই ধারাবাহিকতায় সোমবার থেকে সড়কটির দুইপাশেই অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সিডিএ।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক নূরুল্লাহ নূরী বলেন, ‘বায়েজিদ- ফৌজদারহাট লিংক রোড প্রকল্পে বেপরোয়াভাবে পাহাড়গুলো কাটা হয়েছে। এজন্য সিডিএকে জরিমানাও করা হয়। বিষয়টি এখনো আপিলে অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে নতুন করে কাটতে হবে। এজন্য সিডিএকে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। যাতে পরিবেশ সম্মতভাবে পাহাড়গুলো কাটা হয়।’ তিনি বলেন, ‘ রোববার ভারী বৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়গুলোতে যেকোন সময় ধস শুরু হতে পারে। আমরা রোববার সকাল থেকেই রাস্তাটি বন্ধ করে দিতে বলেছি। রাতের বেলা কোন কারণে ধস শুরু হলে দুর্ঘটনার আশংকা এড়িয়ে দেয়া যায় না। এজন্য সংশ্লিষ্ট থানাগুলোকেও অবহিত করার জন্য আমরা বলেছি। যাতে সড়কটির দুইপ্রান্তে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়।’

এ ব্যাপারে সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘বায়েজিদ লিংক রোডের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো কাটার বিষয়ে আমাদের বিশেষজ্ঞ টিম কাজ করছে। আশা করছি, শীঘ্রই প্রতিবেদন জমা দিতে পারবো। এখন যেহেতু ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পাহাড়গুলোতে ধসের আশংকা রয়েছে। সেজন্য আমরা সড়কটি সোমবার সকাল থেকে বন্ধ করে দেবো। আশা করছি, সড়কটি ব্যবহারকারীরা সোমবার থেকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করবেন।’
সূত্রঃ সীতাকুণ্ড টিভি

Written by Mohammad Nadim

Leave a comment