রম্যরচনা 20200617_140300 Full view

রম্যরচনা

রম্য: অদল-বদল
লেখক: মোশারফ হোসেন অন্তর

হুট করেই একটা মেয়ে জড়িয়ে ধরে বললো, অন্তু এতো দেরি করলে যে? সেই কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি!
.
মেয়েটা জড়িয়ে ধরাতে যতটা অবাক হওয়ার প্রয়োজন ততটা হলাম না! কারণ আমিও এখানে একটা মেয়ের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম! আমার বিয়ের জন্য পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বহু মেয়ে দেখা হয়েছে, কিন্তু কাউকেই আমার তেমন পছন্দ হয়নি। তাই এবার স্বয়ং আমাকেই পাঠানো হয়েছে, নিজের জীবনসঙ্গিনী পছন্দ করার জন্য।
.
এবং আসার সময় বাবা গম্ভীর কণ্ঠে বলেছেন, এটাই তোমার শেষ পাত্রী দেখা। এবার পছন্দ হলেও বিয়ে, না হলেও বিয়ে! একটা অকর্মা গাধার জন্য এতো বেশি পাত্রী দেখার কোন মানে হয় না।
.
আমি যে গাধা সে বিষয়ে কোন সন্দেহ বা সমস্যা নেই। সমস্যাটা হলো জড়িয়ে ধরা নিয়ে। প্রথম দেখাতেই কোন মেয়ে আমায় জড়িয়ে ধরবে, সে প্রস্তুতি আমার কোন কালেই ছিল না। কমপক্ষে বিয়েটা হওয়া পর্যন্ত সুযোগ দেয়া উচিত ছিল। প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললাম, আজ রাস্তায় খুব ট্রাফিক জ্যাম ছিল। তাই আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে।
.
মেয়েটা শান্ত ভাবে বললো, আচ্ছা সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু তোমায় না বলেছিলাম আকাশী রঙের পাঞ্জাবী পরে আসতে! নীল রঙের পরলে কেন?
.
আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে? আপনিই না নীল রঙের পাঞ্জাবী পরতে বললেন!
.
আমার কথা শুনে মেয়েটা মুচকি হাসলো। খেয়াল করলাম মেয়েটার চোখজোড়া ভয়ংকর রকমের সুন্দর। অনেকটা বৃষ্টির পূর্বমুহূর্তে জগৎকালো করা মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো! তার অাধ-খোলা চুল থেকে একটা অপার্থিব ঘ্রাণ পেলাম, যেটা যে কাউকেই মাতাল করে দেবে।
.
মেয়েটা হেসে বললো, বিয়ের আগেই তোমার এই ভুলোমন অবস্থা! বিয়ের পর কী করবে কে জানে? যাইহোক এখন চলো!
.
আমি বিপরীতে বললাম, কোথায় যাবো?
.
এবার মেয়েটা অবাক চোখে বললো, কোথায় মানে! কাজী-অফিসে যাবো।
.
কথাটা শুনেই আমার চোখ কপালে উঠলো। অবাক হওয়ার সমস্ত মাত্রা এক নিমিষেই ছাড়িয়ে গেল। মেয়েটা যে অপূর্ব সুন্দর সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু তাই বলে প্রথম দেখাতেই বিয়ে। এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না! রোমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদ জিম-ডেলা, তাদের কেউ পর্যন্ত প্রথম দেখায় বিয়ে করেছে বলে আমার জানা নেই।
.
মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললাম, বিয়েটা কি আজকেই করতে হবে? দু’একদিন পরে করলে হতো না? প্রথম দেখাতেই কোন মেয়েকে বিয়ে করে বাড়িতে উপস্থিত হলে মা-বাবা কী ভাববে বলুন তো!
.
মেয়েটা স্বাভাবিক ভাবে বললো, কী ভাববে আবার, তোমাকে বর আর আমাকে বউ ভাববে। তাছাড়া এটাই তো কথা ছিল! আর এতো ভয় পাচ্ছো কেন? বিয়েই তো করছো। কোন পাপ কাজ তো করতে যাচ্ছো না!
.
অতি সত্য কথা। বিয়ে করা কোন পাপ কাজ নয়, সওয়াবের কাজ। তাও আবার ফরজের সওয়াব। পাপ হলে আমার আব্বাও নিশ্চয়ই বিয়ে করতেন না! মনের ভেতরে সাহস সঞ্চয় হলো। চুপচাপ কাজী-অফিসে গেলাম। কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই বিয়েটা করলাম।
.
রিক্সায় করে সুন্দরী বউ নিয়ে বাড়ি ফিরছি। বউয়ের দিকে তাকালেই মুচকি মুচকি হাসি পাচ্ছে। মনে মনে ভাবছি, জীবনের প্রথম বাসরঘর, বউয়ের বহু প্রতীক্ষার আদর, বাচ্চাকাচ্চা, তাদের ‘আব্বা আব্বা’ ডাক -ইত্যাদির কথা! এসব ভাবতে গিয়ে আমার খানিকটা লজ্জা লাগলো। পকেটে রুমাল নেই তাই মুখ ঢাকতে পারছি না।
.
কিন্তু এইসব সুন্দর ভাবনার মাঝে মাঝে বাবার রাগী চেহারাটা চোখে ভাসতেই ভয়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুক করে উঠছে! যেন বসন্তের রঙিন দিনের ভেতর, আচমকা একটা কাল-বৈশাখী ঝড়ের ভয়। সৃষ্টিকর্তাই জানেন বাড়ি ফিরলে কী হবে আজ!
.
বাড়ি ফিরতে হলো না, পথেই ঘটনা ঘটলো। মাঝ পথে আমার ফোনে একটা কল আসলো। কলটা ধরতেই একটা মেয়ে কণ্ঠ বিরক্তি নিয়ে বললো, অন্তু সাহেব! কোথায় আপনি? কতক্ষণ ধরে আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি!
.
আমি বিস্মিত কণ্ঠে বললাম, আপনি কে বলছেন?
.
ওপাশ থেকে মেয়েটা উত্তরে বললো, কে মানে? আজ না বিয়ের ব্যাপারে আমাদের দেখা হওয়ার কথা। আমি তো কথামতো সেই রেস্টুরেন্ট-এর সামনেই দাঁড়িয়ে আছি।
.
কথাটা শুনেই মাথায় যেন আস্ত আকাশটা ভেঙে পড়লো। কী শুনছি এসব? আমার পাত্রী যদি রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে তবে যাকে বিয়ে করলাম সে কে? ভয়ে ভয়ে নতুন বউকে বললাম, আচ্ছা বলুন তো আমার পুরো নাম কী?
.
মেয়েটা হাসি দিয়ে বললো, কেন? তুমি তোমার নাম ভুলে গেছ নাকি?
.
– আহ্ বলুন না শুনি!

– তোমার নাম আশিকুর রহমান (অন্তু)!

– হায়! হায়! হইছে কাজ। আরে আমার নাম তো মোশারফ হোসেন (অন্তু)
.
মেয়েটা বিস্মিত কণ্ঠে বললো, মানে?
.
আমি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললাম, মানে টা হলো আপনি যাকে বিয়ে করতে এসেছিলেন আমি সেই ছেলে না, আর আমি যে মেয়েকে দেখতে এসেছিলাম আপনি সে না! তাইতো বলি আপনি বারবার ‘তুমি’ করে বলছেন কেন? পাঞ্জাবীর রঙের ব্যাপারটাই বা মিললো না কেন?
.
মেয়েটা চোখ বড় বড় করে বললো, কী বলছেন এসব? এমন ভুল কেমন করে হয়? আপনি যার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন তাকে কী আপনি আগে কখনও দেখেন নি!
.
আমি শক্ত কণ্ঠে বললাম, আরে নাহ! দেখার জন্যেই তো এসেছিলাম। আপনিও কি ঐ ছেলেকে আগে কখনো দেখেননি ?
.
মেয়েটা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললো, আসলে অন্তুর সাথে আমার দুই বছরের প্রেমের সম্পর্ক। আমরা বিশ্বাস করতাম ভালোবাসা মন দিয়ে হয়, চেহারা দিয়ে নয়। তাই কেউ কাউকে কখনও দেখতে চাই নি। শর্ত ছিল, যেদিন প্রথম দেখা হবে, সেদিনই আমরা বিয়ে করবো। তবে অন্তু বলেছিলো, সে শ্যামবর্ণ, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আছে এবং আসার সময় পাঞ্জাবী পরে আসবে, রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে, যার সব কিছুই আপনার সাথে মিলে গিয়েছিলো। তাছাড়া আপনাকে যখন ‘অন্তু’ ডেকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, তখনও আপনি কিছু বলেন নি। তাই নিশ্চিত হয়েছিলাম যে আপনিই আমার প্রেমিক!
.
আমি শান্ত গলায় বললাম, আমারও তো একই অবস্থা। যাও একটু খটকা লাগছিল, কিন্তু আপনি যখন ‘অন্তু’ বলে ডাক দিলেন, তখন আর কোন সন্দেহ রইলো না। ভাবলাম আপনিই সে পাত্রী। হায়রে ভাগ্য! শেষ পর্যন্ত কী-না ডাকনাম নিয়ে ভয়ংকর ঝামেলায় পড়লাম।
.
কতক্ষণ দুজনেই চুপ থাকলাম। পরিবেশ শান্তু। মামা চুপচাপ রিক্সা চালাচ্ছেন। একটু পর পর আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছেন। খুব সম্ভবত আমাদের ‘অদল-বদল’ বিষয়টাতে উনি খুব আনন্দ পাচ্ছেন। নিরবতা ভেঙ্গে আমি বললাম, সব দোষই আপনার, প্রথম দেখাতেই কেউ কাউকে বিয়ে করে ফেলে, হায় রে প্রেম-ভালোবাসা!
.
মেয়েটা রাগী গলায় বললো, এই যে! আমায় দোষ দেবেন না একদম। নিজেও তো নাচতে নাচতে বিয়ে করতে চলে আসলেন। একবার কি যাচাই করেছিলেন আমি কে? আপনি তো আমার নামটা পর্যন্ত জানেন না!
.
আমি মিনমিন করে বললাম, আপনার নাম কী?
.
মেয়েটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লো। তারপর হতাশার গলায় বললো, আমার নাম রুপা! আর এখন নাম জেনে কী করবেন? যখন জানার দরকার ছিল তখন তো জানেন নি! গাধা কোথাকার!
.
প্রকৃতির এই এক অদ্ভুদ নিয়ম। যার সাথেই আমার পরিচয় হয় প্রথম দিকে আমায় নাম ধরে ডাকলেও, কিছুক্ষণ পরে ‘গাধা’ বলে ডাকা শুরু করে! গাধা প্রাণীটার সাথে আমার কখনও দেখা হয় নি, হলে তাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা যেত!
.
আমি করুনার কণ্ঠে মেয়েটাকে বললাম, দেখুন মিস রুপা, স্যরি মিসেস রুপা। এখন আমরা কী করবো তাই বলুন।
.
আমাকে অবাক করে দিয়ে রুপা বললো, যা হবার তা হবে, আগে আপনার বাড়ি চলুন তো। আমার ফেরার কোন পথ নেই, আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে এসেছি!
.
আমরা বাড়ি পৌঁছালাম। আমার হুটহাট বিয়ের খবর শুনে পরিবারের সবাই রেগে আগুন, বিশেষ করে বাবা। এ নিয়ে পারিবারিক বিচারসভা বসা হলো। আমি আর রুপা অপরাধীর ভঙ্গিতে বসে আছি। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে দরাজ কণ্ঠে বললেন, এটা তুই কী করলি অন্তু! এমন কাজ করতে তোর কী একটুও লজ্জা করলো না!
.
আমি ভদ্রভাবে বললাম, লজ্জা করবে কেন? বিয়েই তো করলাম! আপনিও তো বিয়ে করেছেন! করেন নি?
.
বাবা বিরক্ত গলায় বললেন, আহারে আমার ব্যাপারটা অন্যরকম!
.
আমি অবাক চোখে বললাম, কেন? আপনি কী কোন ছেলেকে বিয়ে করেছিলেন!
.
এর মধ্যে মা রাগী কণ্ঠে বললেন, অন্তু এসব তুই কী বলছিস! বাবার সাথে কেউ এমন করে কথা বলে?
.
আমার উত্তর শুনে বাবার রাগের তাপমাত্রা আরো বেড়ে গেল। তিনি ধমকের স্বরে বললেন, আরে গাধার বাচ্চা! কাউকে না জানিয়ে যে বিয়েটা করে ফেললি, এখন আত্মীয়-স্বজনের সামনে আমার মান-সম্মানটা থাকলো? প্রথমে বলতি যে মেয়েই পছন্দ হয় না, আর এখন কী-না একেবারে বিয়েই করে ফেললি!
.
আমি আবারও ভদ্রভাবে বললাম, সব ঠিক আছে। কিন্তু আমায় ‘গাধার বাচ্চা’ বলাটা আপনার উচিত হয় নি! আমার মা তো গাধা না। উনি বড়জোড় গাধী হতে পারেন!
.
বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, গাধাটাকে এক্ষুণি আমার সামনে থেকে দূর করো।
.
বুঝলাম পরিবেশের অবস্থা খারাপ। দ্রুতই আমি বাবার সামনে থেকে দূর হলাম।
.
দিন ফুরিয়ে রাত আসলো। আমার বহু প্রতিক্ষার বাসরঘর কাটলো রাতে ঘুমিয়ে! আর রুপার কাটলো তার প্রেমিকের সাথে ফোনে কান্নাকাটি করতে করতে। তার প্রেমিক অবশ্য আমার সাথেও কথা বলেছিলো, কিন্তু তার বলার বিষয় একটাই, “ভাই কিছু একটা করেন, কিছু একটা করেন!”

আমি বুঝতে পারলাম না এই মুহূর্তে ‘কিছু একটা’ কী করবো! বেচারার জন্য কষ্ট লাগলো, তার চেয়ে বেশি কষ্ট লাগলো নিজের জন্য! হায়রে কপাল!
.
ভোরে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো আরেক হুলস্থুল কান্ড। যে মেয়ের সাথে আমার দেখা হওয়ার কথা ছিল, সে বাসায় ফোন করে বলেছে আমি সেখানে যাই নি! যদিও এই অদল-বদল বিয়ের ব্যাপারে বাসায় ফিরেই মা-কে সব বলে দিয়েছিলাম। উনি ফেরেসতা পর্যায়ের মানুষ তাই তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখান নি!
.
কিন্তু সকালে মূল ঘটনা শোনার পর থেকেই বাবার প্রেসার হাই হয়ে গেছে! উনি চেঁচামিচি করে পুরো ঘর মাথায় তুলে ফেলেছেন। যাইহোক দ্বিতীয় দফায় পারিবারিক বিচারসভা বসা হলো। আমি আর রুপা ঠোঁট-মুখ শুকনো করে ফাঁসির আসামীর ভঙ্গিতে বসে আছি। যে কেউ দেখলে কোন রকম সন্দেহ ছাড়াই বলে দেবে একটু পর আমাদের ফাঁসি।
.
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন, ছিঃ অন্তু ছিঃ! শেষ পর্যন্ত কী-না একটা মেয়েকে তুই ভাগিয়ে এনে বিয়ে করলি? আমার এইসবও দেখতে হচ্ছে!
.
আমি অতি ভদ্র ভাবে বললাম, না বাবা আপনি ভুল বুঝছেন, সত্যি বলতে আমি রুপাকে ভাগিয়ে আনিনি।
.
বাবা অবাক হয়ে বললেন, তবে?
.
আমি সাফল্যের হাসি দিয়ে বললাম, সে নিজেই ভেগে চলে এসেছে!
.
বাবা রাগী গলায় বললেন, আরে গাধা কথা তো সেই একই হলো। হায়রে কপাল আমার ! লোক জানা-জানি হলে কী হবে? আমি সমাজে মুখ দেখাবো কেমন করে?
.
আমি বাবার দিকে গোয়েন্দার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম, আপনার মুখের আবার কী হলো? ডিজাইন তো ঠিকই আছে দেখছি!
.
বাবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই গাধাটাকে এক্ষুণি সামনে থেকে দূর করো। এক্ষুণি!
.
মায়ের দূর করতে হলো না! বরাবরের মতো এবারও আমি নিজেই দূর হলাম। রুপা আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললো, আচ্ছা, আপনি আপনার বাবার সাথে এমন অদ্ভুদ করে কথা বলেন কেন?
.
আমি স্বাভাবিক ভাবে বললাম, এমন করে কথা না বললে উনি উনার বকবক অনন্ত-অসীম সময় ধরে চালিয়ে যাবেন। তাই এমনকরে কথা বলে উনাকে ভড়কে দেই। ব্যাপারটা ভালো না?
.
রুপা বোকা বনে যাওয়ার ভঙ্গিতে বললো, বুঝতে পারছি না!
.
যাইহোক, কিছুদিনের মধ্যেই পরিবেশ মোটামুটি শান্ত হয়ে গেল। আজকাল রুপাও তার প্রেমিকের সাথে তেমন কথা বলে না, তার কান্নাকাটিও গেল থেমে। থামলো না শুধু রুপার ব্যর্থ প্রেমিকের ফোন কল। বেচারা ক’দিন পরপরই রুপাকে এবং আমাকে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে। আর আমায় শুধু একটা কথাই বলে, “ভাই কিছু একটা করেন! কিছু একটা করেন। আমি রুপাকে ছাড়া বাঁচবো না!”
.
আমি তার কথা মনযোগ দিয়ে শুনি! কষ্ট পাওয়ার ভান করি। কিন্তু বেচারা প্রেমিকের জন্য কী যে করবো সেটা বুঝে উঠতে পারি না!
.
বর্ষার শুরুর দিকের ঘটনা, একদিন খুব করে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি। দেখে মনে হচ্ছে আকাশ তার দীর্ঘদিনের জমানো আবেগ মাটিকে অকাতরে ঢেলে দিচ্ছে।
একটু পরপর শীতল বাতাসের ঝাপটা গায়ে এসে লাগছে। সব মিলিয়ে কড়া রোমান্টিক পরিবেশ। আমি গলা ছেড়ে গাইছি,
যদি ডেকে বলি, এসো হাত ধরো।
চলো ভিজি আজ বৃষ্টিতে।
.
আমার গান গাওয়াতে একটা অদ্ভুদ ঘটনা ঘটলো। হুট করেই রুপা বাইরে বেরিয়ে এলো! আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো, চলো আজ বৃষ্টিবিলাস করি! আমার ভেতরকার আবেক-অনুভূতি সব কেমন যেন ঠিকরে বেরিয়ে এলো। দু’জনে মন ভরে বৃষ্টিতে ভিজলাম। সেদিন রাতেই আমার আর রুপার মধ্যে কিছু একটা ঘটলো; যেটা হয়তো বাসর ঘরেই ঘটার কথা ছিল!
.
তার নির্দিষ্ট সময় পর রুপার কোল আলো করে আমাদের ছেলে সন্তান আসলো। ছেলের নাম রাখলাম ‘শুদ্ধ’। ভাবলাম বহু ভুল-বোঝাবুঝি আর দ্বিধার মধ্য দিয়ে তার আগমন। সবকিছু ভুলে গিয়ে তার নাম ‘শুদ্ধ’ ই হোক।
.
এদিকে শুদ্ধকে পেয়ে পরিবারের সবাই ভীষণ খুশি। আজকাল বাবাও আমায় আর ‘গাধা’ বলে ডাকছেন না। খুব সম্ভবত আমার সম্পর্কে উনার ধারণা খানিকটা পাল্টে গেছে।
.
খুশি হয়নি শুধুমাত্র একজন বান্দা! রুপার ব্যর্থ প্রেমিক অন্তু। সেদিন খবর পেয়ে সে শুদ্ধকে দেখতে আসলো। কথাবার্তার এক পর্যায়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ভাই “কিছু একটা করুন” বলতে আমি অন্য কিছু করার কথা বুঝিয়েছিলাম! ডিভোর্স- টাইপ কিছু একটা, কিন্তু আপনি তো করলেন তার উল্টো!
.
কথাটা শুনে ছেলেটার জন্য আমার খারাপ লাগলো। আমি তার কাঁধে হাত রেখে গম্ভীরভাবে বললাম, অন্তু, একদম আস্থা হারিও না। তোমার জন্যে অবশ্যই কিছু একটা করবো। শুধু বৃষ্টিটা আরেকবার আসতে দাও!

Written by সীতাকুণ্ডবার্তা সম্পাদক

Leave a comment